মাওলানা সাঈদীর মামলায় মিজানুল ইসলামের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন অব্যাহত
মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ধর্ষণ আর অগ্রহায়ণ মাসে বাচ্চা প্রসবের উদ্ভট অভিযোগ
অসুস্থতার কারণে রেকর্ডকৃত সাক্ষ্য বাদ দিলে পুরোটাই বাদ দিতে হবে
মাহবুব হাওলাদারের ঘর থেকে ১০০০ ভরি স্বর্ণ লুট হওয়ার কথা কি বিশ্বাসযোগ্য?
শহীদুল ইসলাম : সাক্ষী মধুসুধন ঘরামীর স্ত্রী শেফালী ঘরামীকে ধর্ষণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে। আর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই অগ্রহায়ণ মাসে তার সন্তান জন্ম হয়। সেই কন্যা সন্তানের নাম হিন্দু ধর্মমতে সন্ধ্যা রাখা হয়। মধুসুধন ঘরামীর রেকর্ডকৃত সাক্ষ্য থেকে এমন উদ্ভট তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ট্রাইব্যুনাল নিজেই বলেছেন, এটা অলৌকিক কিছু হলে সম্ভব। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আইনজীবী এডভোকেট মিজানুল ইসলাম এরূপ বহু অসঙ্গতি তুলে ধরে বলেন, ধর্ষণের ঘটনাটিই বানানো। প্রসিকিউশনের শিখিয়ে দেয়া কথা বলতে গিয়ে এসব অসঙ্গতিপূর্ণ কথা বলেছেন সাক্ষী। তিনি বলেন, সাক্ষীর জবানবন্দী ও জেরার পুরোটাই রেকর্ডকৃত সাক্ষ্য। অসুস্থতার কারণে সাক্ষ্য দেয়ার অযোগ্য হলে তার পুরো সাক্ষ্যই বাদ যাবে। অন্যথায় পুরোটাই গ্রহণ করতে হবে। রেকর্ড থেকে অংশ বিশেষ বাদ দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কাজেই সাক্ষীর রেকর্ডকৃত বক্তব্যে দেলোয়ার সিকদার, পিতা- রসুল সিকদার পরে শুনেছি, সাঈদী এই বক্তব্যের পুরোটাই আদালতকে বিবেচনায় নিতে হবে। এডভোকেট মিজান গতকাল এই মামলার বাদি মাহবুবুল আলম হাওলাদারের ঘর থেকে ৩ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার লুট হওয়ার সাক্ষ্য উল্লেখ করে বলেন, তখন স্বর্ণের ভরি ছিল ৩০০ টাকা। সেই হিসেবে ১০০০ ভরি স্বর্ণালংকার লুট হওয়ার কথা। এই বেকার সাধারণ ক্ষুদ্র কৃষক লোকটার বাড়িতে এতো স্বর্ণালংকার থাকার কথা শুধু কল্পনাতেই সম্ভব। বাস্তবসম্মত নয়। তিনি মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলাটিকে পুরো সাজানো, মিথ্যা বানোয়াট বলে উল্লেখ করে পুনরায় বলেন, এটা শতাব্দীর নিকৃষ্টতম মিথ্যাচার ছাড়া কিছু নয়। এই মামলায় অভিযোগগুলোতে সত্যের লেশমাত্র নেই।
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর উপস্থিতিতে গতকাল ২৭ নবেম্বর সকাল-বিকাল ২ বেলা আর্গুমেন্ট করেন এডভোকেট মিজানুল ইসলাম। বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিকক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ চলছে বিশ্ববরেণ্য এই মোফাসসিরে কুরআনের বিরুদ্ধে মামলা।
পূর্বদিনের শুনানির জের ধরে এডভোকেট মিজানুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার বলেন, সাক্ষী মধুসুধন ঘরামী ট্রাইব্যুনালে সিক বেডে শুয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। অসুস্থ ছিলেন এটা আমরা দেখেছি। তবে তিনি সাক্ষ্য দেয়ার উপযুক্ত বিধায় বুঝে শুনে সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং বুঝে শুনে আমার প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। অসুস্থতার কারণে তিনি সাক্ষ্য দেয়ার অযোগ্য হলে তার কোন কথাই রেকর্ডে থাকার কথা নয়। কোন কিছুই বিবেচনায় নেয়ার কথা নয়। পুরো কথা তিনি বুঝে বলেছেন, আর শুধু দেলোয়ার সিকদার পিতা রসুল সিকদার এই টুকু বুঝে জবাব দেননি একথা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তিনি বলেন, প্রসিকিউশন বহু জায়গায় আপত্তি দিয়েছে। কিন্তু এখানে আপত্তি দেয়নি বা ট্রাইব্যুনালও কিছু বলেনি। লিডিং প্রশ্ন (যার জবাব হ্যাঁ অথবা না) করার পর দেয়া হয়েছে প্রসিকিউশনকে। ডিফেন্সকে নয়। সাক্ষ্য দেয়ার সময় মধু ঘরামীর শরীর আগের চেয়ে ভাল ছিল। সাক্ষ্য দেয়ার পরে তিনি যথারীতি সেইফ হোমে গেছেন। পরের দিন নিজে নিজেই বাড়ি চলে গেছেন। তাকে ১৮ দিন আটকে রেখে প্রসিকিউশন শিখিয়ে শিখিয়ে তার পর ট্রাইব্যুনালে এনেছে তাও সিক বেডে। তাকে নিয়ে প্রথম থেকেই লুকোচুরি করা হয়েছে। কাজেই মধুসুধন ঘরামী আদৌ অসুস্থ ছিলেন কিনা সেটা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
এডভোকেট মিজান মধু ঘরামীর রেকর্ডকৃত সাক্ষ্য থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, তার স্ত্রী শেফালী বেগম কোন রাজাকার, পিস কমিটির চেয়ারম্যান বা সদস্যকে চিনতেন না। তাকে ধর্ষণ করেছে কে? যে তোমাকে মুসলমান বানায় সে এসেছিল। অন্য জায়গায় বলেছেন যে, তাকে মুসলমান বানায় দেলোয়ার সিকদার, পিতা রসুল সিকদার। জোর করে মুসলমান বানানোর পরে মসজিদে নিয়ে নামায পড়াতো। অথচ তিনি বলতে পারেন না ঐ মসজিদের ইমাম, মুয়াজিনের নাম। কতবার মসজিদে আযান হতো তাও বলতে পারেন না। ২০১০ সাল থেকে তাকে সরকার বয়স্ক ভাতা চালু করেছে এই মামলায় সাক্ষী দিতে রাজি হওয়ার পর। এতে স্পষ্ট সরকারি সুবিধা দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এবং সুবিধা পেয়ে মধু ঘরামী প্রসিকিউশনের শেখানো মতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাকে ১৮ দিন আটকে রেখে চাপ দিয়ে তার স্ত্রীর ধর্ষণের কথা বলানো হয়েছে। যুদ্ধের শেষ দিকে ধর্ষণ আর যুদ্ধ চলাকালে অগ্রহায়ণ মাসে বাচ্চা প্রসব কি করে হয়। এ সময় ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, অলৌকিক হলে সম্ভব। মিজানুল ইসলাম বলেন, মধু ঘরামীর কথার মধ্যেই রয়েছে অসংগতি। মধু ঘরামীর স্ত্রী ধর্ষণের কথা তার পরিবারের অন্য কেউ বা ঐ হোগলাবুনিয়া গ্রামেরও কেউ বলেনি। সর্বোপরি এটা মর্মান্তিক যে ৪০ বছর পরে তিনি স্ত্রী ধর্ষণের বিচার চাইতে এসেছেন। যে স্ত্রী এবং সন্তানের খবর তিনি এই ৪০ বছরে রাখেন না। তারা কোথায় থাকে। কি খায়, কি করে, জীবিত আছে না মারা গেছে এসব কোন খবর নেই যার কাছে তিনি সেই স্ত্রী'র কথিত ধর্ষণের বিচার চান। আসলে মামলার প্রয়োজনে মাওলানা সাঈদীকে শাস্তি দেয়ার জন্য শেফালী ঘরামী ধর্ষণের এই কাহিনী বানানো হয়েছে এবং মধুসুধন ঘরামীকে তা বলানো হয়েছে। তার নিজের রেকর্ডকৃত সাক্ষ্যতেই তা ধরা পড়েছে।
নলবুনিয়া গ্রামের পল্লী চিকিৎসক আব্দুল হালিম বাবুলের বাড়িতে ১৯৭১ সালে লুটপাট অগ্নিসংযোগের যে অভিযোগ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে সে প্রসঙ্গে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে এডভোকেট মিজানুল ইসলাম বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা প্রথম মামলার তদন্ত করতে পিরোজপুরে গিয়েছেন ২০১০ সালে ১৮ আগস্ট তারিখে। আর আব্দুল হালিম বাবুলের জবানবন্দী রেকর্ড হয়েছে ২৭ জুলাই ২০১০ তারিখে। তদন্ত শুরুর আগে জবানবন্দী রেকর্ড হয় কি করে? তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই বলেছেন ২০/৯/১০ তারিখে প্রথম বাবুলের সাথে সাক্ষাৎ হয়। আর জবানবন্দী রেকর্ড হয় ২৭/৭/১০ তারিখে। তাহলে কোনটা সত্য। বাবুলের মা জীবিত আছে কি না তদন্ত কর্মকর্তা সে প্রশ্নে বলেছেন তার নোটে নেই। তাতে কর্মকর্তার প্রথম কাজ ছিল ১৯৭১ সালের প্রত্যক্ষদর্শী জীবিত বয়স্ক মানুষের খোজ করা। তিনি বাবুলের মায়ের খোঁজ করেননি, তাদের পরিবারের অন্য কারো খোঁজ করেননি এমনকি নলবুনিয়া গ্রামের ষাটোর্ধ কোন ব্যক্তিরও খোঁজ করেননি। তাহলে তিনি কি তদন্ত করেছেন। এই বাবুল আওয়ামী লীগ করেন সেটাও স্বীকার করেছেন। তার মামা আব্দুর রাজ্জাক আকন এই ট্রাইব্যুনালে বলে গেলেন, ১৯৭১ সালে তার বোনের বাড়িতে (বাবুলের মা) লুটপাট অগ্নিসংযোগের কোন ঘটনা ঘটেনি। বাবুল যা বলেছে তা মিথ্যা। ঐ গ্রামের কেউ এই অভিযোগের পক্ষে আসেনি। বরং বাবুলের মামা বিপক্ষে বলে গেছেন। সাক্ষী তার রাজনৈতিক পরিচয় থেকে সরকারি সুযোগ সুবিধা পেয়ে অথবা পাওয়ার আশায় ট্রাইব্যুনালে অসত্য সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন।
মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের বাদী ও ১নং সাক্ষী মাহবুবুর রহমান হাওলাদারের বাড়ি থেকে তৎকালীন মূল্যে ৩ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার লুট, তার বড় ভাই আব্দুল মজিদ হাওলাদারকে মারধর এবং বাড়িতে ভাংচুরের যে অভিযোগ আনা হয়েছে সে প্রসঙ্গে মিজানুল ইসলাম বলেন, ঐ পরিবারের কেউ, আশপাশের কেউ এমনকি ঐ গ্রামের কোন সাক্ষীকে এর সমর্থনে হাজির করা হয়নি। তিনি আইওর কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছেন কোর্টে তা বলেননি। তৎকালীন মূল্যে ৩ লাখ টাকার স্বর্ণ লুট হওয়ার অভিযোগ কাল্পনিক ছাড়া কিছু নয়। কারণ তখন স্বর্ণের ভরি ছিল ৩০০ টাকা। সেই হিসেবে কমপক্ষে ১ হাজার ভরি স্বর্ণ লুট হওয়ার কথা। এজন্যই আমরা আগেই বলেছি, সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে অভিযোগ শতাব্দীর নিকৃষ্টতম মিথ্যাচার।
তিনি বলেন, দানেশ মোল্লা ইউপি চেয়ারম্যান এবং শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিল। আর অভিযোগ মতে সাঈদী সাহেব ফুটপাতে তেল নুন বেচতেন। তাহলে দানেশ মোল্লা কি করে ফুটপাতে তেল নুন বিক্রেতা সাঈদীর নেতৃত্ব মেনে নিলেন? এটা কি সম্ভব? স্বর্ণ লুটের কথা আইওর কাছে মাহবুব হাওলাদার বলেছে তার ঘর থেকে। আর এখানে এসে বলেছেন মায়ের আলমারী থেকে। তাহলে কোনটা সত্য। তার ভাইকে নির্যাতন করা হয়ে থাকলে ভাইয়ের স্ত্রী এখনো জীবিত আছে। তাকে সাক্ষী করা হলো না কেন? মজিদের ছেলে বাতেন আছে। তাকেই বা কেন সাক্ষী করা হলো না। এমনকি ঐ গ্রামের কোন লোককেও সাক্ষী করা হলো না আর এই বিচার করে নাকি জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা হবে। সেই বিচারের কি তদন্তের নমুনা এই? এই ঘটনায় মোসলেম মওলানা জড়িত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি জীবিত থাকলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি। অভিযোগ আনা হয়েছে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে। এতে স্পষ্ট যে অভিযোগের তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তিদানের সুপারিশ করার পরিবর্তে তদন্ত কর্মকর্তা একজন বিশেষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিদানের সুপারিশ করেছেন। এটা পৃথিবীর ইতিহাসে তদন্তের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। ঐ গ্রামের সাক্ষী যারা আসামীর পক্ষে এসেছেন তারা বলেছেন, '৭১ সালে টেংরাখালী গ্রামে পাক বাহিনী বা রাজাকার যায়নি, কোন লুটপাট, ধর্ষণ, ভাংচুর হয়নি।
নিজামুল ইসলাম বলেন, শুধুমাত্র বয়স বেশি দেখানোর জন্য মাহবুব হাওলাদার নিজের বয়স ৫২ বছর বলেছেন। তার জন্ম সনদ, ভোটার আইডি কার্ডের তথ্য এবং এসএসসি পরীক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশন কার্ডে যেসব তথ্য আছে তা তার নিজের দেয়া। তাতে দেখা যায় মাহবুব হাওলাদারের জন্ম ১৯৫৯ সালে। তার বড় ভাইয়ের জন্ম ১৯৫৭ সালে। তাহলে এখানে তিনি সত্য কথা বলেননি। তার ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে রয়েছে বহু অভিযোগ। তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি ৫০ বার মুক্তিযুদ্ধকালে সুন্দরবন গিয়েছেন। এটা কি করে সম্ভব। তার পুরো বক্তব্যই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। এই সরকারের সময় মুক্তিযোদ্ধা ভাতা এবং স্ত্রীর নামে ভাতা পাচ্ছেন। এহেন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তিনি মিথ্যার পাহাড় রচনা করে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন। এসব অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই।এই পোস্টটি সংকুচিত করুন
মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ধর্ষণ আর অগ্রহায়ণ মাসে বাচ্চা প্রসবের উদ্ভট অভিযোগ
অসুস্থতার কারণে রেকর্ডকৃত সাক্ষ্য বাদ দিলে পুরোটাই বাদ দিতে হবে
মাহবুব হাওলাদারের ঘর থেকে ১০০০ ভরি স্বর্ণ লুট হওয়ার কথা কি বিশ্বাসযোগ্য?
শহীদুল ইসলাম : সাক্ষী মধুসুধন ঘরামীর স্ত্রী শেফালী ঘরামীকে ধর্ষণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে। আর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই অগ্রহায়ণ মাসে তার সন্তান জন্ম হয়। সেই কন্যা সন্তানের নাম হিন্দু ধর্মমতে সন্ধ্যা রাখা হয়। মধুসুধন ঘরামীর রেকর্ডকৃত সাক্ষ্য থেকে এমন উদ্ভট তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ট্রাইব্যুনাল নিজেই বলেছেন, এটা অলৌকিক কিছু হলে সম্ভব। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আইনজীবী এডভোকেট মিজানুল ইসলাম এরূপ বহু অসঙ্গতি তুলে ধরে বলেন, ধর্ষণের ঘটনাটিই বানানো। প্রসিকিউশনের শিখিয়ে দেয়া কথা বলতে গিয়ে এসব অসঙ্গতিপূর্ণ কথা বলেছেন সাক্ষী। তিনি বলেন, সাক্ষীর জবানবন্দী ও জেরার পুরোটাই রেকর্ডকৃত সাক্ষ্য। অসুস্থতার কারণে সাক্ষ্য দেয়ার অযোগ্য হলে তার পুরো সাক্ষ্যই বাদ যাবে। অন্যথায় পুরোটাই গ্রহণ করতে হবে। রেকর্ড থেকে অংশ বিশেষ বাদ দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কাজেই সাক্ষীর রেকর্ডকৃত বক্তব্যে দেলোয়ার সিকদার, পিতা- রসুল সিকদার পরে শুনেছি, সাঈদী এই বক্তব্যের পুরোটাই আদালতকে বিবেচনায় নিতে হবে। এডভোকেট মিজান গতকাল এই মামলার বাদি মাহবুবুল আলম হাওলাদারের ঘর থেকে ৩ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার লুট হওয়ার সাক্ষ্য উল্লেখ করে বলেন, তখন স্বর্ণের ভরি ছিল ৩০০ টাকা। সেই হিসেবে ১০০০ ভরি স্বর্ণালংকার লুট হওয়ার কথা। এই বেকার সাধারণ ক্ষুদ্র কৃষক লোকটার বাড়িতে এতো স্বর্ণালংকার থাকার কথা শুধু কল্পনাতেই সম্ভব। বাস্তবসম্মত নয়। তিনি মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলাটিকে পুরো সাজানো, মিথ্যা বানোয়াট বলে উল্লেখ করে পুনরায় বলেন, এটা শতাব্দীর নিকৃষ্টতম মিথ্যাচার ছাড়া কিছু নয়। এই মামলায় অভিযোগগুলোতে সত্যের লেশমাত্র নেই।
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর উপস্থিতিতে গতকাল ২৭ নবেম্বর সকাল-বিকাল ২ বেলা আর্গুমেন্ট করেন এডভোকেট মিজানুল ইসলাম। বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিকক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ চলছে বিশ্ববরেণ্য এই মোফাসসিরে কুরআনের বিরুদ্ধে মামলা।
পূর্বদিনের শুনানির জের ধরে এডভোকেট মিজানুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার বলেন, সাক্ষী মধুসুধন ঘরামী ট্রাইব্যুনালে সিক বেডে শুয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। অসুস্থ ছিলেন এটা আমরা দেখেছি। তবে তিনি সাক্ষ্য দেয়ার উপযুক্ত বিধায় বুঝে শুনে সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং বুঝে শুনে আমার প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। অসুস্থতার কারণে তিনি সাক্ষ্য দেয়ার অযোগ্য হলে তার কোন কথাই রেকর্ডে থাকার কথা নয়। কোন কিছুই বিবেচনায় নেয়ার কথা নয়। পুরো কথা তিনি বুঝে বলেছেন, আর শুধু দেলোয়ার সিকদার পিতা রসুল সিকদার এই টুকু বুঝে জবাব দেননি একথা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তিনি বলেন, প্রসিকিউশন বহু জায়গায় আপত্তি দিয়েছে। কিন্তু এখানে আপত্তি দেয়নি বা ট্রাইব্যুনালও কিছু বলেনি। লিডিং প্রশ্ন (যার জবাব হ্যাঁ অথবা না) করার পর দেয়া হয়েছে প্রসিকিউশনকে। ডিফেন্সকে নয়। সাক্ষ্য দেয়ার সময় মধু ঘরামীর শরীর আগের চেয়ে ভাল ছিল। সাক্ষ্য দেয়ার পরে তিনি যথারীতি সেইফ হোমে গেছেন। পরের দিন নিজে নিজেই বাড়ি চলে গেছেন। তাকে ১৮ দিন আটকে রেখে প্রসিকিউশন শিখিয়ে শিখিয়ে তার পর ট্রাইব্যুনালে এনেছে তাও সিক বেডে। তাকে নিয়ে প্রথম থেকেই লুকোচুরি করা হয়েছে। কাজেই মধুসুধন ঘরামী আদৌ অসুস্থ ছিলেন কিনা সেটা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
এডভোকেট মিজান মধু ঘরামীর রেকর্ডকৃত সাক্ষ্য থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, তার স্ত্রী শেফালী বেগম কোন রাজাকার, পিস কমিটির চেয়ারম্যান বা সদস্যকে চিনতেন না। তাকে ধর্ষণ করেছে কে? যে তোমাকে মুসলমান বানায় সে এসেছিল। অন্য জায়গায় বলেছেন যে, তাকে মুসলমান বানায় দেলোয়ার সিকদার, পিতা রসুল সিকদার। জোর করে মুসলমান বানানোর পরে মসজিদে নিয়ে নামায পড়াতো। অথচ তিনি বলতে পারেন না ঐ মসজিদের ইমাম, মুয়াজিনের নাম। কতবার মসজিদে আযান হতো তাও বলতে পারেন না। ২০১০ সাল থেকে তাকে সরকার বয়স্ক ভাতা চালু করেছে এই মামলায় সাক্ষী দিতে রাজি হওয়ার পর। এতে স্পষ্ট সরকারি সুবিধা দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এবং সুবিধা পেয়ে মধু ঘরামী প্রসিকিউশনের শেখানো মতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাকে ১৮ দিন আটকে রেখে চাপ দিয়ে তার স্ত্রীর ধর্ষণের কথা বলানো হয়েছে। যুদ্ধের শেষ দিকে ধর্ষণ আর যুদ্ধ চলাকালে অগ্রহায়ণ মাসে বাচ্চা প্রসব কি করে হয়। এ সময় ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, অলৌকিক হলে সম্ভব। মিজানুল ইসলাম বলেন, মধু ঘরামীর কথার মধ্যেই রয়েছে অসংগতি। মধু ঘরামীর স্ত্রী ধর্ষণের কথা তার পরিবারের অন্য কেউ বা ঐ হোগলাবুনিয়া গ্রামেরও কেউ বলেনি। সর্বোপরি এটা মর্মান্তিক যে ৪০ বছর পরে তিনি স্ত্রী ধর্ষণের বিচার চাইতে এসেছেন। যে স্ত্রী এবং সন্তানের খবর তিনি এই ৪০ বছরে রাখেন না। তারা কোথায় থাকে। কি খায়, কি করে, জীবিত আছে না মারা গেছে এসব কোন খবর নেই যার কাছে তিনি সেই স্ত্রী'র কথিত ধর্ষণের বিচার চান। আসলে মামলার প্রয়োজনে মাওলানা সাঈদীকে শাস্তি দেয়ার জন্য শেফালী ঘরামী ধর্ষণের এই কাহিনী বানানো হয়েছে এবং মধুসুধন ঘরামীকে তা বলানো হয়েছে। তার নিজের রেকর্ডকৃত সাক্ষ্যতেই তা ধরা পড়েছে।
নলবুনিয়া গ্রামের পল্লী চিকিৎসক আব্দুল হালিম বাবুলের বাড়িতে ১৯৭১ সালে লুটপাট অগ্নিসংযোগের যে অভিযোগ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে সে প্রসঙ্গে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে এডভোকেট মিজানুল ইসলাম বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা প্রথম মামলার তদন্ত করতে পিরোজপুরে গিয়েছেন ২০১০ সালে ১৮ আগস্ট তারিখে। আর আব্দুল হালিম বাবুলের জবানবন্দী রেকর্ড হয়েছে ২৭ জুলাই ২০১০ তারিখে। তদন্ত শুরুর আগে জবানবন্দী রেকর্ড হয় কি করে? তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই বলেছেন ২০/৯/১০ তারিখে প্রথম বাবুলের সাথে সাক্ষাৎ হয়। আর জবানবন্দী রেকর্ড হয় ২৭/৭/১০ তারিখে। তাহলে কোনটা সত্য। বাবুলের মা জীবিত আছে কি না তদন্ত কর্মকর্তা সে প্রশ্নে বলেছেন তার নোটে নেই। তাতে কর্মকর্তার প্রথম কাজ ছিল ১৯৭১ সালের প্রত্যক্ষদর্শী জীবিত বয়স্ক মানুষের খোজ করা। তিনি বাবুলের মায়ের খোঁজ করেননি, তাদের পরিবারের অন্য কারো খোঁজ করেননি এমনকি নলবুনিয়া গ্রামের ষাটোর্ধ কোন ব্যক্তিরও খোঁজ করেননি। তাহলে তিনি কি তদন্ত করেছেন। এই বাবুল আওয়ামী লীগ করেন সেটাও স্বীকার করেছেন। তার মামা আব্দুর রাজ্জাক আকন এই ট্রাইব্যুনালে বলে গেলেন, ১৯৭১ সালে তার বোনের বাড়িতে (বাবুলের মা) লুটপাট অগ্নিসংযোগের কোন ঘটনা ঘটেনি। বাবুল যা বলেছে তা মিথ্যা। ঐ গ্রামের কেউ এই অভিযোগের পক্ষে আসেনি। বরং বাবুলের মামা বিপক্ষে বলে গেছেন। সাক্ষী তার রাজনৈতিক পরিচয় থেকে সরকারি সুযোগ সুবিধা পেয়ে অথবা পাওয়ার আশায় ট্রাইব্যুনালে অসত্য সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন।
মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের বাদী ও ১নং সাক্ষী মাহবুবুর রহমান হাওলাদারের বাড়ি থেকে তৎকালীন মূল্যে ৩ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার লুট, তার বড় ভাই আব্দুল মজিদ হাওলাদারকে মারধর এবং বাড়িতে ভাংচুরের যে অভিযোগ আনা হয়েছে সে প্রসঙ্গে মিজানুল ইসলাম বলেন, ঐ পরিবারের কেউ, আশপাশের কেউ এমনকি ঐ গ্রামের কোন সাক্ষীকে এর সমর্থনে হাজির করা হয়নি। তিনি আইওর কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছেন কোর্টে তা বলেননি। তৎকালীন মূল্যে ৩ লাখ টাকার স্বর্ণ লুট হওয়ার অভিযোগ কাল্পনিক ছাড়া কিছু নয়। কারণ তখন স্বর্ণের ভরি ছিল ৩০০ টাকা। সেই হিসেবে কমপক্ষে ১ হাজার ভরি স্বর্ণ লুট হওয়ার কথা। এজন্যই আমরা আগেই বলেছি, সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে অভিযোগ শতাব্দীর নিকৃষ্টতম মিথ্যাচার।
তিনি বলেন, দানেশ মোল্লা ইউপি চেয়ারম্যান এবং শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিল। আর অভিযোগ মতে সাঈদী সাহেব ফুটপাতে তেল নুন বেচতেন। তাহলে দানেশ মোল্লা কি করে ফুটপাতে তেল নুন বিক্রেতা সাঈদীর নেতৃত্ব মেনে নিলেন? এটা কি সম্ভব? স্বর্ণ লুটের কথা আইওর কাছে মাহবুব হাওলাদার বলেছে তার ঘর থেকে। আর এখানে এসে বলেছেন মায়ের আলমারী থেকে। তাহলে কোনটা সত্য। তার ভাইকে নির্যাতন করা হয়ে থাকলে ভাইয়ের স্ত্রী এখনো জীবিত আছে। তাকে সাক্ষী করা হলো না কেন? মজিদের ছেলে বাতেন আছে। তাকেই বা কেন সাক্ষী করা হলো না। এমনকি ঐ গ্রামের কোন লোককেও সাক্ষী করা হলো না আর এই বিচার করে নাকি জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা হবে। সেই বিচারের কি তদন্তের নমুনা এই? এই ঘটনায় মোসলেম মওলানা জড়িত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি জীবিত থাকলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি। অভিযোগ আনা হয়েছে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে। এতে স্পষ্ট যে অভিযোগের তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তিদানের সুপারিশ করার পরিবর্তে তদন্ত কর্মকর্তা একজন বিশেষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিদানের সুপারিশ করেছেন। এটা পৃথিবীর ইতিহাসে তদন্তের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। ঐ গ্রামের সাক্ষী যারা আসামীর পক্ষে এসেছেন তারা বলেছেন, '৭১ সালে টেংরাখালী গ্রামে পাক বাহিনী বা রাজাকার যায়নি, কোন লুটপাট, ধর্ষণ, ভাংচুর হয়নি।
নিজামুল ইসলাম বলেন, শুধুমাত্র বয়স বেশি দেখানোর জন্য মাহবুব হাওলাদার নিজের বয়স ৫২ বছর বলেছেন। তার জন্ম সনদ, ভোটার আইডি কার্ডের তথ্য এবং এসএসসি পরীক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশন কার্ডে যেসব তথ্য আছে তা তার নিজের দেয়া। তাতে দেখা যায় মাহবুব হাওলাদারের জন্ম ১৯৫৯ সালে। তার বড় ভাইয়ের জন্ম ১৯৫৭ সালে। তাহলে এখানে তিনি সত্য কথা বলেননি। তার ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে রয়েছে বহু অভিযোগ। তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি ৫০ বার মুক্তিযুদ্ধকালে সুন্দরবন গিয়েছেন। এটা কি করে সম্ভব। তার পুরো বক্তব্যই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। এই সরকারের সময় মুক্তিযোদ্ধা ভাতা এবং স্ত্রীর নামে ভাতা পাচ্ছেন। এহেন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তিনি মিথ্যার পাহাড় রচনা করে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন। এসব অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই।এই পোস্টটি সংকুচিত করুন

